Rajshahi
December 18th, 2017
Business / শিল্প-বাণিজ্য
ভালাইন গ্রাম এখন পাখা গ্রাম নামে পরিচিত
May 18th, 20135,746 views

পাখাগ্রাম নামে কাগজপত্রে কোন নাম নেই। তবুও সবাই পাখা গ্রাম নামেই চেনে গ্রামটিকে। তাল পাতার হাত পাখা তৈরি ও বিক্রি করা এখানকার মানুষের একমাত্র পেশা। এ গ্রামের বাসিন্দা মোট ৬০টি পরিবার। সবাই তাল পাতার হাত পাখা তৈরি ও বিক্রির সাথে জড়িত। বিভিন্ন স্থান থেকে তাল পাতা সংগ্রহ করে পাখা তৈরী এবং বিক্রি করে এই ৬০টি পরিবারের প্রায় ৬ শতাধিক মানুষের জীবিকার ব্যবস্থা হয়ে থাকে।

 

ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে, পুরুষের পাশাপাশি বাড়ির মেয়েরাও ব্যস্ত পাখা তৈরির কাজে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা বিভিন্ন স্থান থেকে তাল পাতা সংগ্রহ এবং পাখা তৈরির যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকেন। আর মেয়েরা তৈরীকৃত পাখা সূতা দিয়ে বাঁধাই এবং বিভিন্ন নকসা তৈরীর কাজ সম্পন্ন করে বাজারজাত করার পর্যায়ে নিয়ে যান। প্রথমে দু’একটি পরিবার এবং পরবর্তীতে তাঁদের দেখে পর্যায়ক্রমে ওই গ্রামের সকলেই পাখা তৈরির কাজে নিযুক্ত হয়ে পড়েন।

 

গ্রামের গৃহবধূ আছমা খাতুন এখন অত্যন্ত নিপুণভাবে পাখা তৈরির কাজ করতে পারেন। ৮ বছর পূর্বে এ গ্রামের সামছুর রহমানের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। শ্বশুর বাড়ির সবাইকে পাখা তৈরী করতে দেখে তিনিও এর নিপুণ কারিগর হয়েছেন বলে তিনি জানালেন। তালের পাতা কাটা ও ছাঁটাই থেকে শুরু করে কয়েক ধাপে শেষ হয় পাখা তৈরির কাজ। পাখা তৈরির শেষ ধাপে রয়েছে সুতা দিয়ে বাঁধাই। আছমা এখন প্রতিদিন একাই ১শ’টি পাখা বাঁধাই করতে পারেন। এ থেকে প্রতিদিন তার প্রায় ১শ’ টাকা আয় হয়। পাখা তৈরির আয়ের টাকা দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি একমাত্র ছেলেকে লেখাপড়া করানোর স্বপ্ন দেখছেন আছমা।

 

শুধু গৃহবধু আছমাই নয়Ñ এ গ্রামের গৃহবধু সুমী, খোরশেদা, সায়রা, শেফালী, কোহিনুর, মালা, শিউলিসহ অনেকের পরিবারই পাখা তৈরি করে উপার্জিত অর্থের ওপর নির্ভরশীল। গ্রামের পুরুষদের সাথে পাখা তৈরির কাজে বাড়ির মহিলারা এবং তরুণ-তরুণীরাও অংশগ্রহণ করে থাকে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সংসারের রান্নাবান্নার কাজ ছাড়া বাকি পুরো সময় তারা পাখা তৈরীর কাজেই ব্যস্ত থাকেন।

 

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মেছের আলী, আব্দুর রহিম, আব্দুল করিম জানিয়েছেন তাঁরা বিগত ৩৫ বছর ধরে পাখা তৈরি করে আসছেন। তাদের ফসলের জমি তেমন নেই। গ্রীষ্মকালে প্রচন্ড গরমে যেহেতু তালের পাখা একমাত্র প্রশান্তি এনে দেয় সেহেতু তালপাখা বিশেষ করে গ্রামীণ মানুষের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় । তালপাখা কালক্রমে আমাদের বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি প্রতীক।

 

তারা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিটি কাঁচা পাতা কমপক্ষে ৫ টাকা করে কিনে আনেন। কাঁচা তাল পাতা নিয়ে এসে পাখা তৈরির উপযুক্ত করতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগে। সুতা ও বিভিন্ন উপদানসহ পাখা বাঁধাই করতে খরচ পড়ে পাখা প্রতি আরো দুই টাকা। তাদের তৈরী এসব পাখা নওগাঁ জেলার বিভিন্ন বাজার ছাড়াও ঢাকা, সৈয়দপুর, সান্তাহার, নাটোর এবং রাজশাহী’র বাজারগুলোতে সরবরাহ হয়ে থাকে। একটি পরিবারে দিনে কমপক্ষে ১শ’টি পাখা তৈরী করতে পারে। পাইকারী মূল্যে প্রতিটি বিক্রি হয় ১২ থেকে ১৫ টাকা। খুচরা বাজারে প্রতিটি পাখা তারা ২০/২৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করে থাকেন। পাইকারীভাবে বিক্রি করলেও তৈরী খরচ বাদ দিয়ে প্রতিটি পরিবার দৈনিক আয় করে থাকে কমপক্ষে ৪শ’ টাকা।

 

পাখার মহাজন সাইফুল ইসলাম বলেন, তিনি এ গ্রাম থেকে পাখা কিনে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে দীর্ঘদিন ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন। তিনি প্রতিটি পাখা বিক্রি করে লাভ করে থাকেন কমপক্ষে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত।

 

মহাদেবপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আমিনুর রহমান বলেন, পাখা গ্রামের কথা তিনি শুনেছেন। এটি একটি শিল্প। এ শিল্পের সাথে জড়িত প্রায় ৬০টি পরিবার। তাদের এ পেশার উন্নয়নে সরকারী কোন সহযোগিতার সুযোগ থাকলে তার পক্ষ থেকে আন্তরিকতার কোন অভাব থাকবে না।