Dhaka
April 21st, 2018
Politics / রাজনীতি
ইসলামি চেতনায় গণবিস্ফোরণ
April 6th, 20134,918 views

শাহবাগি নাস্তিক মুরতাদদের বিরুদ্ধে ঈমানি শক্তিতে জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। গতকাল মহাসাগরের ঊর্মি তুলে রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রস্থলের পুরোটাই ছিল মুসলিম জনতার দখলে। হেফাজতে ইসলামের আহ্বানে অগণিত তৌহিদি জনতার এ জমায়েতকে প্রাণের ভালোবাসা দিয়ে সেবা দিয়েছে ঢাকাবাসী। এমন গণজাগরণ আর আতিথেয়তা আগে দেখেনি কেউ । আসমুদ্র হিমাচলে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে এমন বুলন্দ আওয়াজও কেউ শোনেনি। ডিজিটাল ক্যামেরার চোখে এক ক্লিকে ধরা পড়বে না এ দৃশ্য। দৃষ্টিসীমা যেখানে খেই হারায়, তারপরও মানুষ আর মানুষ। যেদিকে চোখ যায় শুধু টুপি আর সফেদ পাঞ্জাবি। নগরীর রাজপথ-অলিগলি সব যেন মানুষের প্লাবনে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এত মানুষ! এ যেন মানুষের কল্পনায়ও ধারণ করা কঠিন। জনতার এই মহাসাগর থেকে নাস্তিকদের বিরুদ্ধে যে গর্জন ওঠে, তা সাগরের কলধ্বনিকে ম্লান করে দেয়। অবিরল নাস্তিক্যবাদ নিপাতের স্লোগানের তীব্র বজ্রনিনাদ জানিয়ে দিয়েছে, এ যৌবন জলতরঙ্গ রুধিবে কি দিয়া বালির বাঁধ। 
আল্লাহ ও রাসুলকে (সা.) নিয়ে কটূক্তিকারী ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীর ডাকে সাড়া দিয়ে গতকাল একমঞ্চে আসেন দেশের আলেমসমাজ। সরকার পক্ষ হরতাল ও অবরোধ ডেকে ঢাকাকে সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেও লংমার্চ-সমাবেশে তৌহিদি জনতার ঢল নামে। সরকারের এই পাহাড়সম বাধা পেরিয়ে হাতে তসবিহ ও জায়নামাজ নিয়ে মুখে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’ ও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকিরে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে ধর্মপ্রাণ লাখ লাখ জনতা। কেউ দুই দিন, কেউ একদিনে হেঁটে অংশ নেন এ মুক্তির মিছিলে। শুক্রবার রাত থেকেই মতিঝিলের ইসলামি চত্বরের দিকে আসতে থাকে মিছিল। শনিবার ফজরের পর ঢাকার সব প্রবেশদ্বার থেকে আগত মানুষের গতিপথ ছিল ঢাকার মধ্যভাগ। ছিল কেবল জনস্রোত। মতিঝিলকে ঘিরে ঢাকায় তৌহিদি জনতার এই সমাবেশের বিস্তৃতির ওপর নির্ভর করে উপস্থিতির পরিসংখ্যান যথেষ্ট কঠিন। তবে আগত মানুষের ধারণায় এ সংখ্যা ছিল লাখ লাখ। কেউ বলেছে ২৫, আবার কারও মতে ৪০ লাখ। প্রত্যক্ষদর্শীরা ৩৫ কিংবা ৫০ লাখের অনুমানের কথা জানালেও পুলিশ, সাংবাদিক, তৌহিদি জনতা বলেছে, এমন জমায়েত এ বঙ্গে আর দেখেনি। মতিঝিলকে কেন্দ্র করে সমাবেশের বিস্তৃতি ছিল সায়েদাবাদ, কমলাপুর, ফকিরাপুল, কাকরাইল, হাইকোর্ট মোড় ও গুলিস্তান। 
সকাল ১০টায় শুরু হয়ে ওলামা-মাশায়েখদের বক্তৃতা, কর্মসূচি ঘোষণা ও মুনাজাতের মধ্য দিয়ে বিকাল পৌনে ৫টায় মহাসমাবেশ শেষ হয়। তাতানো রৌদ্রের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে বিক্ষুব্ধ মানুষের অবস্থান ছিল অত্যন্ত শৃঙ্খলাপূর্ণ। বিশাল এ মহাজাগরণ থেকে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তি ও ব্লাসফেমি আইন পাস করাসহ ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত আলটিমেটাম দেন। এ সময়ে দাবি না মানলে আগামী ৫ মে ঢাকা অবরোধের ঘোষণা দেন তিনি। একইসঙ্গে আগামীকাল সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল এবং এপ্রিলজুড়ে বিভাগীয় শহরে শানে রিসালাত মহাসমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
লংমার্চ ও মহাসমাবেশ যেন বাংলাদেশে ইসলামি রেনেসাঁর সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশ তাড়ানো দেউবন্দিরা ৬০ বছর ঘুমিয়ে আবার জেগে উঠেছেন সিংহ হুঙ্কারে। ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশদের তাড়াতে আলেমসমাজের ভূমিকার আদলেই যেন এ মহাজাগরণ। ১৯৪৭ সালের পর অনেকটা নিশ্চুপ সিংহরা যেন শতবর্ষী আলেম আল্লামা শাহ আহমদ শফীর হুঙ্কারে গর্জে উঠেছেন। যাদের টুপিওয়ালা মোল্লার দল বলে পরিচিত করা হতো, তারা নাস্তিকদের তাচ্ছিল্যের জবাব দিয়েছে গতকাল।
তৌহিদি জনতার মহাসমাবেশ থেকে আল্লামা আহমদ শফী এ সরকারকে ‘নাস্তিক্যবাদী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে নাস্তিক্যবাদী সরকার থাকতে পারে না। এই সরকারের পতন হবে ফেরাউন, নমরুদ, সাদ্দাদের মতো।’ বুজুর্গ আলমদের বক্তৃতায় প্রাধান্য পায় নাস্তিক ব্লগারদের মুখোশ উন্মোচনকারী আমার দেশ ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান প্রসঙ্গ। তারা বলেন, ‘আমার দেশ ও মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র করা হলে ২৪ ঘণ্টায় সরকারের পতন ঘটানো হবে।’
আগত তৌহিদি জনতার হাতে ছিল ‘নাস্তিক ব্লগরাদের ফাঁসির দাবি’ লেখা প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফেস্টুন। মুখে ছিল ‘বারো আউলিয়ার বাংলায়, নাস্তিকদের ঠাঁই নেই’, ‘আল কোরআনের আলো, ঘরে ঘরে জ্বালো’, ‘নারায়ে তাকবির আল্লাহ আকবর’, ‘সারা বাংলায় খবর দে, শাহবাগিদের কবর দে’, ‘আকাশে ওড়ে চিল, নাস্তিকদের মারো ঢিল’ ইত্যাদি স্লোগান। নাস্তিকদের ফাঁসিসহ ১৩ দফা দাবির পক্ষে গণস্বাক্ষর দেয় অংশগ্রহণকারীরা। 
ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এ লংমার্চ ও মহাসমাবেশে সমর্থন জানায় প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোট, মহাজোটের অংশীদার এরশাদের জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ১৪ দল ছাড়া সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের মিলনমেলায় পরিণত হয় হেফাজতে ইসলামের গণজাগরণ। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ উত্তরায় হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের লংমার্চকে স্বাগত জানায়। ৪২টি স্পটে জাতীয় পার্টি পানি সরবরাহ করে। বিএনপিও ২৪টি স্পটে পানি ও শুকনা খাবার বিতরণ করে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা এবং জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ সমাবেশ মঞ্চে গিয়ে তাদের সমর্থনের কথা জানান। ব্যক্তিগত উদ্যোগে অসংখ্য মানুষ মুসল্লিদের মধ্যে পানি ও খাবার বিতরণ করে। 
বহুল আলোচিত লংমার্চ প্রতিরোধে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রয়োগ করে আওয়ামী সরকার। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামকে দিয়ে শুক্র ও শনিবার ২২ ঘণ্টার অভিনব হরতাল এবং শাহবাগিদের দিয়ে অবরোধ কর্মসূচি আহ্বান করা হয়। এ কর্মসূচির দোহাই দিয়ে সরকার সারাদেশকে ঢাকা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সব পরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়। তবে এসব বাধা তৌহিদি জনতার লংমার্চকে ঠেকাতে পারেনি। দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও ছাত্রলীগ লংমার্চের কাফেলায় হামলা করে। ৪০টি স্থানে প্রতিরোধের ঘোষণা দিলেও ঢাকায় কেবল শাহবাগ, মহাখালী ও সাভার ছাড়া কোথাও দেখা যায়নি শাহবাগিদের।
পরিবহন বন্ধ করে দেয়ায় এক দিন আগেই গত শুক্রবার সকাল থেকে সারাদেশ থেকে লংমার্চ শুরু হয়। পদ্মার ওপার থেকে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কোনো মানুষ গত দু’দিনে ঢাকায় পৌঁছতে পারেনি। ফরিদপুরে হেফাজতে ইসলামের কাফেলায় আওয়ামী লীগ হামলা চালায়। পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলায় এক আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়। 
এদিকে, হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকরা কোথাও হেঁটে, কোথাও রিকশা, টেম্পো কিংবা ট্রাকে চড়ে ঢাকায় পৌঁছে। বদর যুদ্ধের আদলে ৩১৩ জন করে ভাগ হয়ে শহীদি কাফেলা নিয়ে শ’ শ’ মাইল হাঁটেন তারা। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ, শেরপুর, বগুড়া, যশোর, খুলনা, বরিশালসহ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ লংমার্চে অংশ নেন। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় চিটাগাং রোড থেকে লংমার্চমুখী হেঁটে আসা বৃদ্ধ আবুল হাসেমের সঙ্গে কথা হয় আমার দেশ-এর। তিনি জানান, শুক্রবার সকালে শতাধিক মুসল্লির সঙ্গে কুমিল্লা থেকে রওনা হয়েছেন তিনি। কিন্তু, বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের কাছে আসতেই তাদের দু’টো বাসে ছাত্রলীগ-যুবলীগ সশস্ত্র হামলা চালায়। এতে কয়েকজন আহত হন। তাদের নামিয়ে দিয়ে বাস চালকদের জোর করে কুমিল্লায় পাঠায় সরকারি দলের ক্যাডাররা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে লংমার্চের পক্ষে স্লোগান দেন। আধাঘণ্টা পর কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে ১০-১২ জন সেনা সদস্য এসে সবকিছু শুনে মুসল্লিদের পানি ও বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়িত করেন। দু’টি বাস ভাড়া করে সেনা সদস্যরা তাদের নারায়াণগঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। মাদানীনগরের একটি মাদরাসায় রাতযাপন শেষে নারায়াণগঞ্জ থেকে হেঁটে ৬৫ বছরের আবুল হাসেম সমাবেশে যোগ দেন। সারাদেশ থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষ এভাবেই নানা বাধা পেরিয়ে লংমার্চে অংশ নেন। 
মতিঝিলের ‘ইসলামি চত্বর’ একখণ্ড বাংলাদেশ : মতিঝিলের সমাবেশস্থলকে ‘ইসলামি চত্বর’ ঘোষণা দেয় হেফাজতে ইসলাম। এই চত্বরকে ঘিরেই দেশের গ্রামগঞ্জ থেকে ছুটে আসে ধর্মভীরু মুসলমানরা। হাতে তসবিহ ও জায়নামাজ, আর মুখে আল্লাহু আকবর ও লা ইলাহা ইল্লাহ জিকিরে তৌহিদি জনতার গন্তব্য ছিল ইসলামি চত্বর। সারাদেশ থেকে ছুটে আসা মানুষের ক্ষোভের অগ্নিস্লোগান জানান দেয় হৃদয়ের আকুতি। ১৩ দফা দাবি ছাড়া তাদের সবার মুখে ছিল মুক্তির স্লোগান। ইসলামি রেনেসাঁর ডাক দিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেন হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। 
পুলিশ সমাবেশের সীমানা নির্দিষ্ট করে দিলেও জনস্রোতে সকাল ৯টার পরই তা ছাড়িয়ে যায়। এরপর যারা এসেছেন, কেউ ইসলামি চত্বরের মূল মঞ্চ দেখতে পারেননি। দৈনিকবাংলা, ইত্তেফাক মোড়, নটরডেম কলেজ এলাকা ৯টার মধ্যেই জনসমুদ্রে পরিণত হয়। বিকাল তিনটা পর্যন্ত মিছিল এসেছে, তবে সমাবেশের মেসেজ লোকমুখে শুনেই বাড়ি ফিরেছেন তারা। আর নতুন করে মাইক স্থাপন করতে না পারায় অর্ধেক লোকও ওলামা-মাশায়েখদের বক্তৃতা শুনতে পারেনি। এমন ঐতিহাসিক মহাসমাবেশের সরাসরি সম্প্রচারে বেসরকারি টেলিভিশনের কার্পণ্য নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আয়োজকরা। বারবার লোডশেডিংয়ে বক্তৃতায় বিচ্যুতি ঘটলেও জনসমুদ্রের শৃঙ্খলা এবং নিয়মানুবর্তিতায় তা সমাবেশে প্রভাব ফেলেনি। জামাতে জোহরের নামাজ আদায়ে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মুসল্লিরা। ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক থাকলেও লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকায়। এমন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাড়াবাড়ি করতে এসে ডিএমপি কমিশনার বেনজীর আহমেদ ও এডিসি মেহেদী হাসান তোপের মুখে পড়ে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বেনজীর ও ইসলামি চত্বর মঞ্চের পাশে মেহেদীকে ক্ষুব্ধ জনতা পানির বোতল ছুড়ে মারে। 
এক মোহনায় সব ইসলামী দল : ইসলামের হেফাজতে এই প্রথম এক মোহনায় মিলিত হয়েছে দেশের সব ইসলামি দল। সর্বজন শ্রদ্ধেয় আলেম কওমি মাদরাসা বোর্ডের চেয়ারম্যান আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নেতৃত্বে ‘হেফাজতে ইসলাম’-এর ব্যানারে তারা ঐক্যবদ্ধ হলো। নাস্তিক ব্লগারদের শাস্তিসহ ১৩ দফা দাবিতে এ জোটটি ঐতিহাসিক লংমার্চ ও মহাসমাবেশের ইসলামি মহাজাগরণের সৃষ্টি করেছে। এ প্লাটফর্মে রয়েছে প্রবীণ আলেম শাহ আহমদুল্লাহ আশরাফের নেতৃত্বাধীন খেলাফতে আন্দোলন, মুফতি আমিনী প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ঐক্যজোট, অধ্যক্ষ মাওলানা ইসহাকের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস, প্রিন্সিপাল হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, শায়েখ আবদুল মোমিনের নেতৃত্বাধীন জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম, মাওলানা আবদুর রকিবের নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলাম পার্টি, মাওলানা আবুল হাসনাত আমিনীর নেতৃত্বাধীন খেলাফতে ইসলামী এবং ১১টি ইসলামী ও সমমনা ছাত্রসংগঠন। হেফাজতে ইসলামের দাবির সঙ্গে একমত হয়ে গতকালের কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়ে অংশ নেয় চরমোনাই পীরের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও ড. ঈসা শাহেদীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ঐক্য আন্দোলন। দেশের প্রধান ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীও এতে পূর্ণ সমর্থন দেয়। এছাড়া প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের সব শরিক, মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি (এরশাদ), অরাজনৈতিক সংগঠন আমরা ঢাকাবাসী, নাগরিক অধিকার রক্ষা কমিটি, শত নাগরিক এ কর্মসূচিতে সমর্থন দেয়।
ইসলামি দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উত্সাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। নাস্তিক-মুরতাদদের বিভিন্ন আস্ফাালনে ক্ষুব্ধ জনতা ঈমানি চেতনায় বলীয়ান হয়ে গতকালের কর্মসূচিতে যোগ দেয়।
মতিঝিলে ইসলামপ্রিয় তারুণ্যের ঢল : বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এ সমাবেশে তরুণদের আধিক্য ছিল চোখে পড়ার মতো। তরুণদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বয়োবৃদ্ধরাও ছুটে এসেছেন এ সমাবেশে। ইসলামের পবিত্রতা রক্ষা, আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তিকারীদের ফাঁসির দাবিতে লংমার্চ-পরবর্তী এ সমাবেশে দেখা গেছে কুলি, মুটে-মজুর তথা শ্রমিক শ্রেণীর অভাবনীয় উপস্থিতি। আল্লাহতে বিশ্বাসী তরুণ ব্লগার, সাংবাদিক ও লেখকরা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে হেফাজতে ইসলামের চলমান কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেন। সমাবেশে আসা তরুণরা জানান, আমরা রাজনীতি বুঝি না। এখানে এসেছি আল্লাহর কাছে হাশরের ময়দানে জবাবদিহি করতে। পবিত্র ধর্ম ইসলাম ও মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি করলে কোনো মুমিন ঘরে বসে থাকতে পারেন না। আমরাও পারিনি, তাই ছুটে এসেছি। তারা বলেন, আমরা ইমাম হোসেনের উত্তরসূরি। ইসলাম রক্ষায় কারবালার ময়দানে হাসিমুখে জীবন দিয়েছিলেন তিনি। আমরাও আজ প্রাণের ধর্ম ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা রক্ষায় জীবন দিতে রাজপথে নেমে এসেছি। তরুণদের অনেকে শাহবাগিদের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ওরা ব্লগার, কুলাঙ্গার। পুলিশ পাহারায় বসে বসে লম্বা লম্বা কথা বলে। সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করলে এক মিনিটও ওরা শাহবাগে থাকতে পারবে না। দেশের জনগণ নাস্তিক-কুলাঙ্গারদের দেশ থেকে বের করে দিতে প্রস্তুত রয়েছে। 
ইসলামপ্রিয় জনতা জাতীয় সংসদে ব্লাসফেমি আইন পাসের মধ্য দিয়ে নাস্তিক শাহবাগি ব্লগারদের ফাঁসির দাবি জানায়। সংবিধানে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সংযোজন করারও দাবি জানান তারা। 
ইসলামপ্রিয় তারুণ্য যা বললেন : প্রাণের টানে মতিঝিলে ছুটে আসা মুক্তমনা তরুণ ব্লগার ও মানবাধিকার কর্মী রণতরী খান বলেন, ইসলাম কচুপাতার পানি নয় যে, শাহবাগের গঞ্জিকাসেবীরা ফুঁ দেবে আর উড়ে যাবে। আজকের ইসলামি জনতা হাসিনা সরকারকে দেখাল মুসলমানের শক্তি। পুরো বিশ্ব দেখল ইসলামের মাহাত্ম্য। লাখ লাখ মুসলিম, তবুও কোনো সহিংসতা হয়নি। সারাদিন মতিঝিলে আছি। এমন দৃশ্য জীবনে আর আল্লাহ দেখাবেন কিনা জানি না। 
তিনি বলেন, শাহবাগের কথিত আন্দোলন আমাদের মতো তরুণ প্রজন্মকে কলঙ্কিত করেছে। যারা মতপ্রকাশের নামে পবিত্র ধর্ম ইসলাম ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কুত্সা রটনা করেছে, আমরা তাদের ফাঁসি চাই। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বলতে চাই—ওরা আসল ব্লগারদের শ্রেণীভেদের মধ্যে পড়ে না। ওদের স্থান কেবলই শাহবাগে। আরেক ব্লগার ইবনে বেলাল বলেন, শাহবাগিরা মতপ্রকাশের নামে অসভ্যতা করছে। আমরা ওদের ফাঁসি দাবি করছি। হজরত ইমাম হোসেন যেমন কারবালার ময়দানে ইসলামের মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছিলেন, আজ আমরা তার উত্তরসূরি তরুণ প্রজন্ম রাজপথে নেমেছি ইসলামের মর্যাদা রক্ষায় জীবন বিলিয়ে দিতে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ও ব্লগার অর্ণব মামুন বলেন, ‘কোনো কথা আজ শুনতে চাই না। আজ আছি সবাই মতিঝিলে। জামায়াত-শিবির কিংবা বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগের হালুয়া রুটি খেতে আমরা এখানে আসিনি। এসেছি বিশ্বনবীর মর্যাদার প্রতি সম্মান জানাতে, এসেছি রাসুলকে (সা.) কটূক্তিকারী কথিত মূর্খ ব্লগারদের শাস্তির দাবি নিয়ে। ‘আরে ভাই বাঁচব বা আর কয়দিন তাই ক্ষুদ্র এই জীবনে প্রাপ্ত বেশকিছু দিন থেকে অন্তত আজকের দিনটি আমি ইসলামের জন্য দান করলাম।’ যোগ করেন তিনি। শাহবাগি ব্লগারদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী ও ব্লগার পাভেল সারওয়ার বলেন, হাসিনাকে আমরা ইসলামের শত্রু মনে করি। আজ তার মদতে শাহবাগে যে নাটক চলছে, তার দায়ভার হাসিনাকেই নিতে হবে। আমরা শাহবাগি ব্লগার নামক কুলাঙ্গারদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী তালহা বিন আলাউদ্দিন বলেন, আমাদের আত্মসত্তায় আঘাত করেছে শাহবাগিরা। ওরা যুক্তিতে না পেরে আমাদের ধর্ম ও নবীজীকে নিয়ে নগ্ন কুত্সায় মেতেছে। তাই আজ আর ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। ঈমানের তাগিদে আমরা রাস্তায় নেমে এসেছি। শাহবাগি কুলাঙ্গারদের শেষ দেখে তবেই আমরা তরুণ প্রজন্ম ঘরে ফিরব। বুয়েটের আরেক শিক্ষার্থী আবদুল হাই নাফিস বলেন, বিধর্মীদের বিরুদ্ধে রাসুলের যুদ্ধগুলো আমি চোখে দেখিনি। দেখিনি সাহাবাদের পরবর্তী যুগের বিজয়গুলো। তবে দু’বছর আগে তাহরির স্কয়ারে আমি মুসলমানদের বিজয় দেখেছি টিভির পর্দায়। আজ আমি সত্যিই আনন্দিত, আমার মাতৃভূমিতে মুসলমানদের বিজয় দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাই আজ মতিঝিলে এসেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কামরুল হাসান বলেন, শাহবাগে পুলিশ পাহারায়-ফ্রি খিচুড়ি খেয়ে যারা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে তারা বাংলাদেশের জন্য লজ্জা। আজকের তরুণ প্রজন্ম পুলিশের কামানের সামনে লড়ে এদেশে ইসলামের বিজয় সূচিত করবে ইনশাআল্লাহ। শাহবাগিদের ফাঁসি না দেয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। 
আরেক শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, আমরা মুসলিম উম্মাহ কারও শত্রু নই। সবাই এক আল্লাহর বান্দা, এক নবীর উম্মত। তাই নবীর প্রশ্নে কোনো ছাড় নেই। ওরা লিখতে জানে না বলেই অসভ্য ভাষায় পবিত্র ধর্ম ইসলাম ও মহানবীকে নিয়ে আক্রমণ করেছে। আমরা তাই আজ বলতে এসেছি। শাহবাগিরা পথভ্রষ্ট তরুণদের সঙ্গে আপামর মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। এদেশের অধিকাংশ তরুণ আল্লাহ ও তার রাসুলকে ভালোবাসে। 
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রোকনুজ্জামান বলেন, এখানে না এলে জীবনে একটা অতৃপ্তি থাকত। আল্লাহর রাসুলকে নিয়ে কুত্সা কোনোভাবোই মেনে নেয়া যায় না। আমরা শাহবাগি কুলাঙ্গারদের ফাঁসি দাবি ও শাহবাগের নাস্তিক্যবাদী মঞ্চ ভেঙে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। 
তৌহিদি জনতা নাস্তিকদের ফাঁসি চায় : মুন্সীগঞ্জ সদর থেকে আসা হোমিওপ্যাথি চিকিত্সক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ব্লগারদের ফাঁসির দাবিতে আমরা মুন্সীগঞ্জ থেকে হেঁটে এসেছি। সরকারকে অবশ্যই জাতীয় সংসদে আইন পাস করতে হবে। নইলে আমরা ঘরে ফিরে যাব না। ব্যবসায়ী রকিব আনসারি বলেন, কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহতা’আলা আমাদের জিজ্ঞাসা করবে ইসলাম রক্ষার ডাকে তোমরা জিহাদের ময়দানে এসেছিলে কি-না। আজ যদি আমরা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে করা কটূক্তির প্রতিবাদে শামিল না হই, তবে হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে আমরা কি জবাব দেব। আমি আল্লাহর ভয়ে পবিত্র ধর্ম ইসলাম রক্ষায় আজ আল্লামা শফীর ডাকে ছুটে এসেছি। কেরানীগঞ্জ থেকে আসা হাবিবুর রহমান বলেন, রাসুলের অপমান কোনো মুসলমান সইতে পারে না। আমরাও পারিনি। ওদের ফাঁসি চাই। পিরোজপুর থেকে আসা ওয়ার্কশপ কর্মী মো. আল-আমিন বলেন, মন্ত্রিসভা থেকে হাসানুল হক ইনুসহ নাস্তিকদের সরাতে হবে। শাহবাগের মঞ্চ ভেঙে দিয়ে তাদের ফাঁসি দিতে হবে। ফেনীর আবদুল আলিম বলেন, মুসলমানরা অনেক ধৈর্য ধরেছে। বরিশাল থেকে আসা হাসানুজ্জামান সোহেল বলেন, ওরা মুসলিম সেন্টিমেন্টে নগ্নভাবে আঘাত করেছে। আমরা তাই শাহবাগিদের বিচার চাই। 
মিরপুরের ব্যবসায়ী জুয়েল বলেন, ইসলামি আকিদা সমুন্নত রাখতে আমরা এ প্রতিবাদে শামিল হয়েছি। যশোরের আবদুল্লাহ বলেন, আজ কোনো কথা নেই। একটাই দাবি শাহবাগি নাস্তিকদের ফাঁসি চাই। বিক্রমপুর থেকে আসা শহীদুল ইসলাম বলেন, সব নবীপ্রেমিক আজ মতিঝিলে এসে হাজির হয়েছে। আমরা একটি দল হেঁটে এ প্রতিবাদে শামিল হয়েছি। নারায়ণগঞ্জের গাড়িচালক মনির বলেন, ইমরান (শাহবাগিদের কথিত মঞ্চের আহ্বায়ক) চোরারে গ্রেফতার করা হোক। তার জন্যই দেশে আজ এত সমস্যা। গাজীপুর থেকে আসা নজরুল ইসলাম ও ফাহিম উদ্দিন বলেন, দেশে আজ মুসলমানিত্ব নিয়ে টিকে থাকাটা দায়। তাই আমরা মুসলমান হিসেবে এখানে ছুটে এসেছি। এলিফ্যান্ট রোডের ব্যবসায়ী হাবুিবর রহমান বলেন, ছাত্রলীগ-যুবলীগ ও পুলিশ মিলে মুসল্লিদের বিভিন্ন জায়গা থেকে বাড়িতে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। এলিফ্যান্ট রোড, কাঁটাবন ও শাহবাগে তাদের বাধা দেয়া হয় বলে জানান তিনি। শরীতপুরের নড়িয়া থেকে আসা মো. সবুজ ও হাফেজ মোশাররফ বলেন, আমরা নবীজীর সম্মান রক্ষায় এ লংমার্চে হাজির হয়েছি। লক্ষীপুরের সালাহউদ্দিন বলেন, আমাদের মনে যে ক্ষোভ আছে তা প্রকাশ করতেই এখানে এসেছি।