Rangpur
October 19th, 2018
Your e-Mail / অভিমত
চাঁদাবাজি-টেন্ডারবাজি:কিছু সুপারিশ
August 8th, 20114,434 views

মোহাম্মদ ইসমাইল

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও সিটবরাদ্দ-বাণিজ্য, সিন্ডিকেট-বাণিজ্য বা এ ধরনের অন্যান্য অপরাধমূলক কার্মকান্ড বাংলাদেশে নতুন নয়। এর উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। স্থান-কাল-পাত্রভেদে অবশ্য এর ধরন ও মাত্রায় পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়ে আসছে। তবে নির্বাচিত সরকারের শাসন আমলে এ সকল অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন ফ্রন্টের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের একটি অংশ এ অপরাধসমূহের মূল হোতা। পেশাদার অপরাধীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের আজ্ঞাবহ লাঠিয়াল বা 'জুনিয়র পার্টনার' মাত্র। এদেরকে শায়েস্তা করার ব্যাপারে হাঁক-ডাক ছাড়লেও ভেতরে ভেতরে এদের প্রতি সরকারকে দুর্বলতা প্রদর্শন করতে দেখা যায়। ফলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি অপরাধ বন্ধ হয় না।

আমাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সমস্যার সমাধানকল্পে নিম্নবর্ণিত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থাসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে:

১. কর্মীদের উপর নেতাদের নির্ভরশীলতা হ্রাসকরণ: আমাদের রাজনীতিতে নেতারা কর্মীদের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। কেন ও কিভাবে তা উপরে আলোচিত হয়েছে। কর্মীদেরকে বিপদ-আপদ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে নেতাকে রক্ষকের ভূমিকায় নামতে হয়। যদি নির্ভরশীলতার মাত্রা কম হতো, তা'হলে তাদেরকে এদের প্রতি অতিমাত্রায় নমনীয় ভাব দেখাতে হতো না। সেক্ষেত্রে আইন অমান্যকারী কমর্ীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণে সংশিস্নষ্ট কতর্ৃপক্ষকে তারা বাধ্য করতে পারতেন; নিদেনপক্ষে তাদেরকে বাঁচানোর জন্য তদ্বির না করে অন্তত নিষ্ক্রিয় থাকতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্নতর হওয়ায় অধিকাংশ নেতার পক্ষেই নিষ্ক্রিয় থাকা সম্ভবপর হয় না। সে কারণেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ইত্যাদি দমন করতে গ্রহণীয় প্রথম পদক্ষেপটি হবে কর্মীদের উপর নেতাদের নির্ভরশীলতার মাত্রা হ্রাস করা। উলেস্নখ্য, যে সকল কর্মকান্ডের জন্য কর্মীদের উপর নেতৃবৃন্দ বেশী নির্ভরশীল, তার প্রধানটি হচ্ছে নির্বাচন। নির্বাচন প্রধানত কর্মী-নির্ভর একটি কর্মকান্ড। কর্মী নেই তো নির্বাচনে পরাজয় নিশ্চিত। এ কথা সকল দল ও প্রার্থীর জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। কর্মীদের উপর নির্ভরশীলতা হ্রাস করার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পন্থাটি হতে পারে নির্বাচনে ভোট প্রদানকে বাধ্যতামূলক করা। যথাযথ কারণ ব্যতিরেকে কেহ ভোটদানে বিরত থাকলে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যায়। এ ব্যবস্থা নিতে হলে ভোটারদের সুবিধার্থে ভোটকেন্দে র সংখ্যা বৃদ্ধি করা, নির্বাচনে 'না' ভোটের বিধান রাখা ইত্যাদি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হবে যাতে ভোটদান ঝামেলাপূর্ণ বা পছন্দের প্রার্থী না থাকার অজুহাত দেখিয়ে কেহ ভোটদানে বিরত থাকতে না পারে। কোন নির্বাচনে না-ভোটের সংখ্যা সর্বোচ্চ হলে পুন:নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভোটদান বাধ্যতামূলক হলে কর্মীদেরকে ভোটার আনা-নেয়ার কাজ করতে হবে না; প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় ও কর্মী-নির্ভরতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। এটা সৎ ও যোগ্য প্রার্থীর নির্বাচিত হবার পথকে সুগম করবে। ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি নিয়ে রাজনীতির মাঠে আগত বিত্তশালীদের আনাগোনা উলেস্নখযোগ্যভাবে কমবে। কর্মীদের তদ্বির নিয়ে জনপ্রতিনিধিদেরকে রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানোর আবশ্যকতা ততটা থাকবে না। বর্তমান বিশ্বের উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত ৩০ টির অধিক দেশে বাধ্যতামূলক ভোটদান সক্রান্ত আইন রয়েছে। জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় ১৭৭৭ সালে সর্বপ্রথম বাধ্যতামূলক ভোটিং প্রথা চালু হয়েছিল। ১৯১৫ থেকে কুইন্সল্যান্ডে অঙ্গ রাজ্যে এবং ১৯২৪ থেকে সমগ্র অস্ট্রেলিয়ায় বাধ্যতামূলক ভোটিং প্রথা চালু আছে। এর ফলে নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৪৫% থেকে ৯৬% ভাগে উন্নীত হয়েছে। 'জুরী' হিসেবে কাজ করার বাধ্যবাধকতা যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক উন্নত দেশে চালু রয়েছে। এতে প্রতীয়মান, প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় কাজে অংশ গ্রহণে নাগরিকদের বাধ্য করানোর ঘটনা নতুন কিছু নয়।

২. কতিপয় অপরাধকে দন্ডবিধিভুক্তকরণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ: রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কতর্ৃক সরকারী কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে হস্তক্ষেপ করা, সরকারী কর্মচারী কতর্ৃক রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করা ও অন্যায়ভাবে কোন কর্মকর্তার পদোন্নতি আটকানোসহ এ প্রক্রিয়ার সাথে যে কোনভাবে জড়িত হওয়াকে ফৌজদারী অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এবং এ সব অপরাধ যারা করবে তাদেরকে ফৌজদারী আইনের আওতায় দন্ড প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারী কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এর ২০ ধারায় বর্ণিত রাজনৈতিক তদ্বির সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপীল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর ২ (এফ) উপ-ধারা মতে অসদাচরণ বলে গণ্য এবং অসদাচরণের জন্য চাকরিচু্যতিসহ যে কোন গুরুদন্ড আরোপের বিধান রয়েছে; কিন্তু বাস্তবে এ বিধিমালার আওতায় কোন কর্মচারীর বিরুদ্ধে কোনদিন কোন অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানা যায়নি। নিতে হবে। তদ্বিরকারী গণপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কোন সুনির্দিষ্ট আইনের অস্তিত্ব আছে বলে জানা নেই। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কেন তদ্বির করে বা কেন সরকারী কর্মচারীরা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করে তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে। সিভিল সার্ভিসের বর্তমান দুরবস্থা ক্যাডারভুক্ত কর্মকর্তাদেরকে রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করার প্রণোদনা দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অবিলম্বে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ দর্শানো ব্যতিরকে 'গণ কর্মচারী (অবসর) আইন, ১৯৭৪' এর ৯ (২) ধারায় সরকারী কর্মচারীকে চাকরি হতে অবসর প্রদানের বিধান বাতিল করা জরুরী। এটা করা হলে সরকারী কর্মচারীরা ঊধর্্বতন কতর্ৃপক্ষের বেআইনী আদেশ-নিষেধ পালন থেকে অনেকটা মুক্ত থেকে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সহসী হবেন। ফলে অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া সহজ হবে।

৩. ছাত্রনামধারী অছাত্রদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বেরকরণ এবং ছাত্রদের ছাত্র-রাজনীতির নিয়ামক ও নিয়ন্ত্রক হওয়া নিশ্চিতকরণ: বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্র-নেতৃত্ব সর্বোচ্চ ২৭ বছর বয়স-সীমার ছাত্রদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা নির্বাচন করা নিশ্চিত করা হলে অপরাধ জগতের সাথে জড়িত ছাত্রনামধারী অ-ছাত্ররা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছিটকে পড়বে, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির মত অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ছাত্রদের অংশ গ্রহণ হ্রাস পাবে, ছাত্র-রাজনীতির গুণগত মান বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার যথোপযুক্ত পরিবেশ দ্রুত ফিরে আসবে। পূর্বের ন্যায় হার্ডকোর ছাত্র-রাজনীতিকদের সরকারী চাকরিতে নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। এ ব্যবস্থা আমলাতন্ত্রকে অনেকটা রাজনীতিমুক্ত রাখবে এবং রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে।

উপরে বর্ণিত পদক্ষেপসমূহ নেয়া হলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী সংস্থাসমূহসহ সাধারণ প্রশাসনে যে উন্নততর পরিবেশের সৃষ্টি হবে, তাতে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজ এবং সিন্ডিকেট-বাণিজ্য, ছাত্রভর্তি, ছাত্রাবাসে সিটবরাদ্দ-বাণিজ্য ইত্যাদির মূল হোতাসহ কোন অপরাধীই টিকে থাকতে পারবে না। টিকে থাকতে পারবে না প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতিবাজরাও। উলেস্নখ্য, এ কাজ করতে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে আবশ্যিকভাবে। আর এক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে হবে সরকারী দল তথা সরকারকেই।

[লেখক : বাংলাদেশ সরকারের প্রাক্তন অতিরিক্ত সচিব]