Sylhet
November 17th, 2018
Politics / রাজনীতি
যায় যদি বাংলাদেশের সৈন্য আফগানিস্তান
October 1st, 20104,537 views

আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানো নিয়ে কথা উঠেছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে দেখা করেছেন একজন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা। খবর বেরিয়েছে ওই বৈঠকে আফগানিস্তানে বাংলাদেশের সৈন্য পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ বা মার্কিন পক্ষের কোনো অফিসিয়াল বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি। খবরটি প্রকাশের পর তালেবানদের পক্ষে বাংলাদেশকে সতর্ক ও হুমকি দেওয়ার খবরও ছাপা হয়েছে বিদেশি মিডিয়ায়।

এখন প্রশ্ন, সত্যি সত্যি সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলে এর লাভক্ষতি কি হবে বাংলাদেশের? আমি ব্যক্তিগতভাবে যেকোনো বিদেশি মিশনে দেশের সৈন্য পাঠানোর পক্ষে। এর মাঝে নানা দেশের জাতিসংঘ মিশনের বাংলাদেশের সৈন্য একটি প্রশংসনীয় বাস্তবতা। জাতিসংঘ মিশনে এখন বাংলাদেশের সেনা সদস্যই বেশি। সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরাও সেখানে যাচ্ছেন। একবছর পর যে দলটি যাবে তার তালিকাটি তৈরি হয়ে যাচ্ছে প্রায় একবছর আগে। এতে করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের পেশাগত মান-দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বৈদেশিক সম্পর্ক-যোগাযোগ। বাংলাদেশ সরকার তথা সংশ্লিষ্ট বাহিনী বা সদস্যদের অর্থনৈতিক লাভালাভের বিষয়টিও আছে। মৌলবাদী জঙ্গি সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে স্বদেশের মাটিতে বাংলাদেশ যে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, আফগানিস্তান বা ইরাকে সৈন্য পাঠালে গড়ে উঠবে তার আন্তর্জাতিক পার্টনারশিপ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের গুরুত্ব আরো বাড়বে।

আবার স্যার আইজ্যাক নিউটনের প্রতিক্রিয়ারই সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়ার মতো এর ভিন্ন অনেক সমস্যাও আছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথা বললেও আফগানিস্তান ও ইরাক অভিযানের যৌক্তিকতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের সবাই একমত নন। অনগ্রসর-দারিদ্র্যপীড়িত আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা আর সেদেশে উপস্থিত মার্কিনসহ বহুজাতিক বাহিনীর বিদেশি সেনাদের অবিরাম উপস্থিতি নিয়ে দেশগুলোর ভিতরেই বিরূপ জনমতের পাল্লা ভারি হচ্ছে প্রতিদিন। অস্ট্রেলিয়ার সৈন্যও আছে আফগানিস্তানে। তাদের অনেকে প্রায়ই সেখানে মারা পড়ছেন। একজন সৈনিকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রীকে পার্লামেন্টে বা মিডিয়ার সামনে কথা বলতে হচ্ছে। নারী-শিশুদের বিরুদ্ধে অসি সৈনিকদের নিষ্ঠুরতার খবর মিডিয়ায় আসলে সে জন্যও জবাবদিহি করতে হচ্ছে সরকারকে। আফগানিস্তানে সেনা উপস্থিতি, তালেবান সন্ত্রাসের শিকার অনেক আফগান নানাভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ায়। রাজনৈতিক আশ্রয়ের আশায় অনেকে এখনো আসছেন। অসি জনমতও ওই কারণে সরকারের ওপর ক্ষ্যাপা। কারণ এদেশে যত মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আসেন বা আশ্রয় পান তাদের প্রাথমিক ভরণ-পোষণসহ অনেক দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হয়। এর পুরোটাই বহন করতে হয় জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। এসব কারণে জনমতের পাল্লা প্রতিদিন ভারি হচ্ছে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য ফিরিয়ে আনার পক্ষে। বিষয়টি নিয়ে জনমত ঠাউর করতে পারছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এখন শূন্যস্থান পূরণে নিজস্ব স্বার্থে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর দিকে তারা হাত বাড়াতেই পারেন। এর জন্য টাকা-পয়সাসহ অনেক প্রস্তাবও আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি লাভক্ষতির স্বার্থে আপদকালীন লাভালাভ চিন্তা বাদ দিতে হবে। বাংলাদেশের আন্তঃদেশীয় যে বাস্তবতা তা সেখানে সৈন্য পাঠানোর উপযোগী-অনুকূল নয়। বাংলাদেশের সিংহভাগ আমজনতা জানেন এবং বিশ্বাস করেন আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনীর যুদ্ধটি আসলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ! নানা কারণে তারা অভিযোগটি খণ্ডাতে ব্যর্থ হয়েছে। এখন এ অবস্থায় যদি বাংলাদেশ সেখানে সৈন্য পাঠাতে যায়, সে সিদ্ধান্তকে পুঁজি করে সরকারের বিরুদ্ধে ধর্মপ্রাণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তুলতে সক্রিয় হয়ে উঠবে একদল মোল্লা-মৌলভী। বিশেষ করে পরিস্থিতির সুযোগ নিবে জামায়াতে ইসলামী। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে কেন্দ্র করে দলটি এখন বিশেষ করে কোণঠাসা। এ ইস্যুতে ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে তারা দেশজুড়ে বিশেষ একটি পরিস্থিতির সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। বিএনপি এখনো এ নিয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি। মার্কিন আগ্রহের বিপক্ষে সরাসরি বক্তব্য দেওয়া বিএনপির পক্ষেও সহজ নয়। কিন্তু মাঠে তেমন পরিস্থিতি পাওয়া গেলে এর সুযোগ নিতে তারা পিছপা হবে তা মনে করার কারণ নেই।

আফগানিস্তানে এখন পুনর্বাসনের কাজ করছে ব্র্যাকসহ বাংলাদেশের নানা প্রতিষ্ঠান। বিশেষ করে ব্র্যাকের কাজটি বিশাল। ব্র্যাকের পরিচিতি-জনপ্রিয়তা সেখানে এতটাই যে, বাংলাদেশের ভিসা পাওয়া যাবে মনে করে সেখানকার অনেকে কাবুলের ব্র্যাক অফিসেও যায়। আফগান পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সেখানে শুধু তালেবান নয়, ছোটখাটো অনেক জঙ্গি, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীও গড়ে উঠেছে। এরা সুবিধামতো বিদেশিদের অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় করে। ব্র্যাক আফগানিস্তানের একাধিক সদস্যও গত কয়েকবছর সেখানে এ ধরনের অপহরণের শিকার হয়েছেন। আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৈন্য পাঠালে তাদের জীবন-ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। এর প্রতিক্রিয়াও কাবুল-কান্দাহার গড়িয়ে চলে আসবে বাংলাদেশে। এসব কারণেও অনেকের মতামত হচ্ছে বাংলাদেশের এ ব্যাপারে সরাসরি 'না' বলা উচিত।

এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইলে বাংলাদেশের মতো দেশ কি সরাসরি 'না' বলতে পারে বা পারবে? এ নিয়ে প্রশ্নও কম নয়। এ ব্যাপারেও যৌক্তিক একটি অবস্থান আছে বাংলাদেশের। সেটি হলো বাংলাদেশের সৈন্যসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য বিদেশের যে যেখানে আছে সবাই আছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে। যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অসন্তোষ, দুর্যোগ বিধ্বস্ত দেশগুলোতেই মূলত অন্তর্বর্তীকালীন পুনর্বাসনের দায়িত্ব পালন করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী।

ইরাক বা আফগানিস্তানে তেমন বাহিনী নেই। ভবিষ্যতে যদি সেখানে জাতিসংঘ বাহিনী মোতায়েন করা হয় তখন বাংলাদেশ প্রস্তাব বিবেচনা করতে পারে। তাছাড়া আফগানিস্তান এখন সার্কের সদস্য দেশ। সার্ক সদস্যভুক্ত কোনো দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া সৈন্য পাঠানোর রেওয়াজ নেই। এটি সার্ক চার্টারেরও পরিপন্থী। এর সবদিক বিবেচনায় রেখে আফগানিস্তানে সৈন্য পাঠানোর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া উচিত বাংলাদেশের।

লেখক : সিডনি প্রবাসী সাংবাদিক।