Dhaka
November 17th, 2018
Politics / রাজনীতি
কাউকে বাঁচাতেই ময়না তদন্ত রিপোর্ট?
January 25th, 20136,264 views

তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্ব হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেছে, বিশ্বজিত্ হত্যা-কাণ্ডের ঘটনার একাধিক ভিডিও ফুটেজ আছে। গ্রেফতারকৃত আসামিরা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনার চাক্ষুষ সাক্ষী রয়েছেন। ইতিমধ্যে দেড়মাস পেরিয়ে গেছে, তবে এখনো কেন অভিযোগপত্র (পুলিশ প্রতিবেদন) দাখিল করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগপত্র দাখিলে বিলম্ব হোক এটা আমরা চাই না। তদন্তকারী কর্মকর্তাকে দ্রুত পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। 

বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের ডাকে অবরোধ চলাকালে পুরান ঢাকায় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হাতে নির্মমভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে নিহত হন দর্জি দোকানি বিশ্বজিত্ দাস। ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গত রবিবার হাইকোর্টে দাখিল করা হয় লাশের সুরতহাল ও ময়না তদন্ত প্রতিবেদন। এগুলো পর্যালোচনা করে মঙ্গলবার ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক ও সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী চিকিত্সককে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। সেই নির্দেশ মোতাবেক গতকাল আদালতে হাজির হন বিশ্বজিতের লাশের ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক মাকসুদুর রহমান ও সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী সূত্রাপুর থানার এসআই মো. জাহিদুল হক। ময়না তদন্ত ও সুরতহাল প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট বলে, প্রতিবেদনে বিশ্বজিতের পিঠে, কোমরের ওপর ও পায়ে হালকা জখম দেখা যাচ্ছে। ডান হাতের পাখনার নিচে তিন ইঞ্চি জখম, বাম পায়ের হাঁটুর নিচে ছেঁড়া জখম রয়েছে। আদালত বলেন, 'বিশ্বজিত্ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে ময়না তদন্ত প্রতিবেদন অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কাউকে বাঁচানোর জন্যই কি এ ধরনের প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে?' 

শুনানিতে আদালতের জিজ্ঞাসার জবাবে এসআই বলেন, ঘটনার দিন বেলা পৌনে ১২টায় আমি লাশের সুরতহাল করেছি। সুরতহাল করার সময় ডান হাতের পাখনার নিচে বড় ধরনের জখম দেখতে পেয়েছি। সেখান দিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণেই বিশ্বজিত্ মারা যান। তিনি বলেন, একজন রিকশাচালক বিশ্বজিেক হাসপাতালে নিয়ে যান। ওই রিকশাচালক আমাকে বলেছেন, তাকে প্রথমে ন্যাশনাল হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানকার চিকিত্সকরা তাকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, কোন পুলিশ নয়, একজন রিকশাওয়ালা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন। এটা জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যজনক। 

ডা. মাকসুদুর রহমান বলেন, ডান পাখনার নিচে ধমনী (আর্টারি) কেটে যাওয়ার কারণেই বিশ্বজিত্ মারা যান। 

হাসপাতালের জরুরি বিভাগে বিশ্বজিেক যথাযথ চিকিত্সা দেয়া হয়েছিলো কিনা-আদালতের এমন প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রপক্ষের ডেপুটি এটর্নি জেনারেল এডভোকেট অমিত তালুকদার বলেন, এ ব্যাপারে আমার কাছে সঠিক কোনো তথ্য নেই। তবে সকাল ৯টা ২৫ মিনিটে বিশ্বজিেক হাসপাতালে নেয়া হয়। এর ২৫ মিনিট পর তিনি মারা যান। তখন আদালত বলেন, জরুরি বিভাগে রোগী ফেলে রাখা নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক সেবা দেয়ার জন্য রসিদ বা টাকার প্রসঙ্গ পরে আসতে পারে। এক্ষেত্রে সবার আগে চিকিত্সকের প্রথম দায়িত্ব হলো রোগীর জীবন বাঁচানো। আদালত বলেন, আমরা (আদালত) যদি আরো কঠোর না হই তাহলে চিকিত্সার অবহেলার কারণে রোগীর মৃত্যুর ঘটনা বন্ধ হবে না। আমাদের আরো কঠোর হতে হবে। এসব ঘটনায় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণই যথেষ্ট নয়, জড়িতদের কারাগারে পাঠাতে হবে।

এদিকে বিশ্বজিতের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন নিউজের ভিডিও ফুটেজ আদালতে প্রদর্শন করা হয়। এরপর আদালত ময়না তদন্তকারী চিকিত্সকের উদ্দেশে বলেন, ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, ভিকটিম কখনোই এক জায়গায় স্থির ছিল না। অধিকাংশ সময়ই সে দৌড়াচ্ছিল। ফুটেজতো ভিন্ন কথা বলছে। এ পর্যায়ে আদালত চিকিত্সকের কাছে জানতে চান, কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ময়না তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন কি? জবাবে চিকিত্সক বলেন, না। লাশের শরীরে আঘাতের চিহ্ন যা পেয়েছি তাই প্রতিবেদনে লিখেছি। আদালত বলেন, আপনি কি কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন? চিকিত্সক বলেন, না। এ পর্যায়ে আদালত বলেন, ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, ভিকটিমের বামপাশে চাপাতি দিয়ে কোপ দেয়া হচ্ছে। এটাতো আপনার প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে ময়না তদন্ত প্রতিবেদন সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও উল্লেখ করে আদালত। 

এ সময় এডভোকেট মতিন খসরু বলেন, গোটা জাতি এ বীভত্স হত্যাকাণ্ডের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। এ ঘটনার সঠিক বিচার হতেই হবে। একটা মানুষকে কি কেউ এভাবে মারতে পারে? এ পর্যায়ে আদালত বলেন, একজন মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে, এটাই বড় কথা। আমরা যদি এখন কোনো আদেশ দেই সেক্ষেত্রে মামলাটির বিচার কাজ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তখন ডেপুটি এটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার বলেন, মামলাটি মুলতবি থাকুক। পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করতে দেরি হলে আদালত হস্তক্ষেপ করতে পারবে। তখন আদালত দুই মাস শুনানি মুলতবি করে দ্রুত পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য তদন্তকারী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।