Dhaka
January 20th, 2018
Politics / রাজনীতি
বেপরোয়া কর্মীদের নিয়ে বিব্রত আওয়ামী লীগ
October 1st, 20102,143 views

দেশের শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসকদের একজন অধ্যাপক প্রাণ গোপাল দত্ত দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক। একই সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। অথচ তাকেও গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের একটি অংশ লাঞ্ছিত করে। এ অবস্থা শুধু যে বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ে তা নয়, সারা দেশেই নিয়োগ, টেন্ডারবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, দলীয় কোন্দলে জর্জরিত আওয়ামী লীগ। এছাড়া পাবনা পরিস্থিতিতে নড়েচড়ে বসেছে দেশের প্রশাসন।

ছাত্রলীগ-যুবলীগের ব্যানারে একশ্রেণীর কর্মীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বারবার বিব্রত করছে সরকারকে। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনে আনন্দমিছিলে ছাত্রলীগ কর্মীদের চুল টানাটানির ঘটনা সচেতন মহলকে ভাবিয়ে তুলেছে। দলের অভ্যন্তরের অবস্থা ভালো নয়। ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মাঠপর্যায়েও প্রকট। বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ দলের উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। এর আগে উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে মাত্র একবার বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় যোগ দিতে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রীর দলের প্রেসিডিয়াম সদস্যদের সঙ্গে এবং ফিরে এসে উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে বৈঠক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, আজকের বৈঠকে সরকার ও দলের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন উপদেষ্টারা। দেশব্যাপী দলের নাজুক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলবেন তারা।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক অনুপস্থিতিতে প্রশাসন থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা যেন সুযোগ পেয়ে বসেছিলেন। প্রশাসনের সর্বত্র চেইন অব কমান্ড অনেকটা ভেঙে পড়েছিল। ছাত্রলীগের লাগাম যেন টেনে ধরতে পারছিল না কেউ। এর কারণ খুঁজতেই আজকের এ বৈঠক। গত কয়েক মাসে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড আর সরকারদলীয় সমর্থকদের বাড়াবাড়ি সরকারের সমন্বয়ের অভাবের বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে বেশ কিছুদিন ধরে মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে এমপিরা সরাসরি হস্তক্ষেপ করে আসছেন; নিয়োগ-টেন্ডারবাজি নিয়ে প্রাধান্য বিস্তার করে নিজেদের মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। এর বাইরে নন দলের নারী কর্মীরাও। টেন্ডারবাজিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্বয়ং দলের মহিলা এমপি সারাহ বেগম কবরী। নেতৃত্ব নিয়ে নারী কর্মীদের মধ্যে চুল-ছেঁড়াছেঁড়ির ঘটনাও ঘটছে। অনেক জায়গায় দলীয় নেতা-কর্মীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তারা প্রশাসনকেও তোয়াক্কা করছেন না। সম্প্রতি টাঙ্গাইলে এসপিকে হুমকি দেন এক আওয়ামী লীগ নেতা।

সম্প্রতি সরকারকে সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় ফেলে পাবনা পরিস্থিতি। নিয়োগ পরীক্ষা ঘিরে প্রশাসন বনাম স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দ্বন্দ্ব সংঘাতে রূপ নেয়। প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকুর হস্তক্ষেপে অবশ্য এর নিরসন হয়। তবে পাবনার ডিসি, এসপিসহ কর্মকর্তাদের বদলি আলোচিত ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়োগ, টেন্ডারবাজি, দলীয় কোন্দল সরকারের ভিতকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করে দিয়েছে। সংসদ সদস্য ও স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান দ্বন্দ্ব প্রকট রূপ নিয়েছে প্রায় সর্বত্র। বরিশালে এমপি মণি ও উপজেলা চেয়ারম্যান গোলাম ফারুক দ্বন্দ্ব চরমে। এভাবে গত এক মাসে অন্তত ২০টি বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দিয়েছেন শাসক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে গেছে যে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগের বড় শত্রু এখন আওয়ামী লীগ।

এদিকে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অন্যান্য এমপির প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আফসারুল আমীনের কাছে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে কৈফিয়ত তলব সাধারণ মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এ ছাড়া মুঠোফোনে মন্ত্রী জিএম কাদেরকে বারবার হুমকি আইনশৃক্সখলার অবনতির বিষয়ই তুলে ধরে। ফলে সব মিলিয়ে সরকার পড়েছে চ্যালেঞ্জের মুখে।

আর এ চ্যালেঞ্জ উত্তরণে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সব নতুন করে ভাবছেন। সরকারের প্রায় ২০ মাসে তিনি উপলব্ধি করতে পারছেন, দল পরিচালনায় অভিজ্ঞ নেতাদের বিকল্প নেই। আর এ কারণেই প্রবীণ নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে তার কাছে।

আজকের বৈঠক প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অন্যতম উপদেষ্টা আমির হোসেন আমু বলেন, সাম্প্রতিক সব পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা হতে পারে।

আরেক উপদেষ্টা অধ্যাপক একে আজাদ চৌধুরী বলেন, তিনি তার আলোচনায় দলের সাংগঠনিক বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন।

উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ঘটনায় সরকার ও দল বিতর্কিত হয়েছে, সেসব বিষয় নিয়ে আজকের বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।

তবে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছে, একটির পর একটি ঘটনার জন্ম দিয়ে দল ও সরকারকে বিতর্কিত করে তোলা দলীয় নেতা-কর্মী এবং প্রশাসনে থাকা সুবিধাভোগীদের যদি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে সরকারের ভাবমূর্তি বলে আর কিছু থাকবে না। আজকের এ বৈঠকে সরকারের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পরিষদ অধিক গুরুত্ব দেবে বলে পর্যবেক্ষক মহল প্রত্যাশা করে।