Dhaka
September 20th, 2018
Islam / ধর্মচিন্তা
রসূল (স.)-এর অনুসরণই মিলাদুন্নবীর দাবি
January 25th, 20136,204 views
প্রশ্ন: প্রত্যেক বছরের মত এবারও পবিত্র মিলাদুন্নবী (স.) আমাদের মাঝে রসূল প্রেমের বার্তা নিয়ে হাজির। এ ব্যাপারে আপনার অনুভূতি কি?

উত্তর: একটি গজলে আছে "রবিউল আওয়াল এলে তোমারী গান গাই, রবিউল আওয়াল গেলে তোমায় ভুলে যাই" মূলত: রবিউল আওয়াল মাস রসূলের (স.)- জন্ম ও ওফাতের মাস বিধায় এ মাস আগমন করলে প্রতিবছরই মুমিন হূদয়ে আনন্দের হিল্লোল প্রবাহিত হয় ও শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে। তবে এ মাসই যে 'কেবল রসূলের প্রেমে নিবেদন করতে হবে তা কিন্তু নয়, সারা বছর সারা জীবনের জন্য রসূলের প্রেমে নিজেকে সমার্পন করাই রসূলের খাঁটি উন্মতের পরিচয়। আমরা মিলাদুন্নবী (স.) কে স্বাগতম জানাই। কারণ এ মাসে নতুন করে শপথ নিয়ে ঈমানকে উজ্জীবিত করার অনুপ্রেরণা নিহীত। 

প্রশ্ন: রসূল (স.) বলেন, আমি আমার পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়া, হযরত ঈসা (আ.)-এর ভবিষ্যত্ বাণী এবং আমার মায়ের সত্য স্বপ্নের ব্যাখ্যা। এই কথাটি বিশ্লেষণ করবেন কি?

উত্তর: হযরত ইব্রাহিম (আ.) মহানবী (স.)-এর জন্য আল্লাহতায়ালার কাছে দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ! আমার কওমে আপনি এমন একজন নবী পাঠান যিনি আপনার আয়াতগুলো তেলাওয়াত করে শোনাবে। তাদেরকে কিতাব ও হেকমাত শিক্ষা দেবে। তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে। এটা আল্লাহতায়ালা কবুল করেন। হযরত ঈসা (আ.) এর ওপর নাযিলকৃত ইঞ্জিল কেতাবে আছে। ঈসা (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, "মিম বা'আদি ইসমুহু আহমাদ" আমার পরে একজন নবী আছেন যার নাম আহমাদ। এছাড়া রসূল (স.)-এর মা একদিন স্বপ্নে দেখলেন যে, তাঁর পেট হতে একটি আলোকরশ্মি বের হয়ে সিরিয়ার প্রাসাদগুলো আলোকিত করে ফেলেছে। এগুলির ব্যাখ্যাই হলো রসূল (স.)-এর নবী হিসেবে পৃথিবীতে আগমন।

প্রশ্ন: শিশু বেলা হতেই মহানবীর মাঝে নবী সূলভ ভাব গাম্ভীর্য পরিদৃষ্ট হতো। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?

উত্তর: ছোট বেলা হতেই মহানবী (স.) -এর মধ্যে নবী সূলভ অনেক অবস্থা গোচরীভূত হতো। যেমন তিনি সব সময় থাকতেন সৌম্য শান্ত, ধীরস্থির, ভাবগাম্ভির্যপূর্ণ। অহেতুক কথা বলতেন না। অন্য শিশুদের মত দৌড়-ঝাপ, চেচামেচী ইত্যাদি করতেন না।

প্রশ্ন: কি কারণে "হিলফুল ফুযুল" গঠিত হয়েছিল? মহানবী (স.) কেন এই সংগঠনে যোগ দিয়েছিলেন?

উত্তর: ফজল নামক এক ব্যক্তি এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মহানবী (স.) কিশোর অবস্থায় তার চাচা আব্বাসের সাথে হরবুল ফুজ্জার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হয়েছিলেন। যুদ্ধ শেষ করে ভাবলেন যে, সমাজ থেকে যুদ্ধ বিগ্রহ বন্ধ করতে হলে একা একা সম্ভব নয়। সে কারণে তিনি এমন একটি সংঘবদ্ধ সংগঠনের কথা ভাবছিলেন। যারা সমাজ থেকে যুদ্ধ-বিগ্রহ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি, লুটতরাজ, জেনা-ব্যাভিচার বন্ধ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। হিলফুল ফুযুলের শপথ নামায় এসব কথাগুলোর সন্নিবেশ ঘটনায় মহানবী (স.) অবিলম্বে এই সংগঠনের সদস্য হয়ে তাবত অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কিন্তু আশাতীত সুফল পাওয়া সম্ভব হয়নি।

প্রশ্ন: মহানবী (স.)-এর সঙ্গে হযরত খাদিজা (রা.)-এর যখন বিবাহ সংঘটিত হয় তখন মুহাম্মদ (স.)-এর বয়স তাঁর চেয়ে ১৫ বছর কম। এ বিয়ের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে কিছু বলুন—

উত্তর: রসূল (স.)-এর যশ খ্যাতি সেই বাল্যবেলা হতেই সবার মুখে মুখে ছিল। সে সময় তিনি আল আমিন, আস সাদিক উপাধী পেয়েছিলেন। মক্কায় যদি একজন ব্যক্তিকে বিশ্বাস করা যায় তিনি ছিলেন মুহাম্মদ (স.)। হযরত খাদিজা (রা.)-এর পিতা খুয়াইলিদের ইন্তেকালের পর হতে তিনি তাঁর ব্যবসা দেখার জন্য একজন বিশ্বস্ত লোক খুঁজছিলেন। অবশেষে মহানবী (স.)-এর সাথে পরিচয় এবং তাঁর কাজে মুগ্ধ হয়ে দাসী নফিসা কর্তৃক বিবাহের প্রস্তাব। রসূল (স.) চাচা আবু তালিবের পরামর্শে এই বিবাহে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। তখন রসূল (স.)-এর বয়স ২৫ বছর। খাদিজা (রা.)-এর বয়স ৪০ বছর।

প্রশ্ন: মহানবী (স.) গারে হিরা থেকে প্রকম্পিত অবস্থায় ঘরে ফিরে এলেন। এর পর কখন বুঝতে পারলেন যে, তিনি আল্লাহর নবী?

উত্তর: নবুওয়াতের পূর্বে মুহাম্মদ (স.) দীর্ঘ দিন যাবত্ হিরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় অতিবাহিত করেন। অবশেষে যখন তাঁর বয়স ৪০ হয় তখন হঠাত্ একদিন জ্যোতির্ময় ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) তাঁর সান্নিধ্যে এলেন। ফেরেশতা তাঁর ওপর সূরা আলাকের ১-৫ আয়াত পর্যন্ত নাজিল করলেন। এরপর কাঁপতে কাঁপতে বাড়ীতে এলেন। পরের দিন সকাল বেলা খাদিজা (রা.) মহানবী (স.) কে তাওরাত বিশেষজ্ঞ ওয়ারাকা বিন নওফেলের কাছে নিয়ে যান। তিনি রসূল (স.) কে নবী হিসেবে ঘোষণা দেন এবং তাকে সকল প্রকার সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করার কথা ব্যক্ত করেন।

প্রশ্ন: রসূল (স.) নবুওয়াত পাওয়ার পর গোপনে তিন বছর দাওয়াত দেন। এরপর সাফা পাহাড়ে প্রকাশ্যে দাওয়াতের সময় কাফেরদের বিরোধীতার মূল কারণ কি ছিল?

উত্তর: তাদের বিরোধীতার মূল কারণ ছিল একাত্ববাদ নিয়ে। তারা মূলত: বহু ইলাহ্ এর ওপর বিশ্বাসী ছিলো। বহু দেবদেবীর পূজা অর্চনা করতো। মহানবী (স.) যখন তাদের মাঝে এক ইলাহ্ এর কথা বললেন তখন শুরু হলো বিরোধিতা।

প্রশ্ন: মহানবী (স.)-এর দাওয়াত স্তব্ধ করার জন্য তারা কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল?

উত্তর: যখন অবিশ্বাসীরা দেখলো মুহাম্মদ (স.) তাদের পূর্ব পুরুষদের প্রথা বিরোধী দাওয়াত শুরু করেছে। তখন এটা স্তব্ধ করার জন্য প্রথম দিকে তার চলার পথে কাটা বিছিয়ে রাখা হতো। নামাজরত অবস্থায় উটের নাড়ি ভুঁড়ি মাথায় চাপিয়ে দেয়া হতো। কবি, জাদুকর, পাগল ইত্যাদি বলে তাকে মানসিকভাবে কষ্ট-যন্ত্রণা দেওয়া হতো। এরপর নানা প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। যেমন সুন্দরী-নারী, নেতৃত্ব ও অর্থ সম্পদ দিতে চাওয়া। মহানবী (স.) তাদের ঐ সমস্ত প্রস্তাবের বিপরীতে চাঁদ সূর্য দিলেও দাওয়াত বন্ধ করবেন না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেন।

প্রশ্ন: মহানবী (স.)-এর শাহাদত আঙ্গুলের ইশারায় আকাশের চন্দ্র দ্বি-খন্ডিত হয়। বিষয়টি পরিষ্কার করে বলবেন কি?

উত্তর: এটা রসূল (স.) একটি অন্যতম মু'জিজা। আল্লাহর প্রেরিত নবী রাসূলগণ তাদের নবুওয়াতের সত্যতার প্রমাণ উপস্থাপনের জন্য আল্লাহর সাহায্যে কিছু কিছু ম'জিজা প্রদর্শন করেছেন। এটা ছিল তেমন একটি ঘটনা। অবিশ্বাসীরা বলেছিল, মুহাম্মদ (স.) আপনি যদি আকাশের পূর্ণিমার চন্দ্রটিকে দ্বিখন্ডিত করতে পারেন তাহলে অবশ্যই আমরা তোমার নবুওয়াত বিশ্বাস করবো। তখন আল্লাহর নির্দেশে শাহাদত আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করা মাত্র চন্দ্র দ্বি-খন্ডিত হয়ে এক খন্ড সাফা পাহাড়ে আরেক খন্ড মারওয়া পাহাড়ে এসে পড়ল। তখন অবিশ্বাসীরা এটা জাদু বললো। কুরআনের সূরা কামারের ১,২,৩ আয়াতে বলা হয়েছে— "কেয়ামত নিকটবর্তী হয়ে গেছে এবং চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এরা কোন নিদর্শন দেখলে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে এটাতো চিরাচরিত জাদুকরী ব্যাপার। এমনিভাবে তারা সত্য অস্বীকার করে এবং খেয়াল-খুশির অনুসরণ করে চলে'। ১৯৬৯ সালে নীল আর্মসট্রং, মাইকেল কলিঞ্চ এডউইন অলড্রিন চাঁদে গিয়ে ফাটলের চিহ্ন দেখতে পান। এখানে নীল আর্মস্ট্রং একটি মৃদু আওয়াজ শোনেন। অবশেষে পৃথিবীতে নেমে আসেন এবং তার মিশর সফরকালে হঠাত্ ঐ একই আওয়াজ শুনে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়েন। খোঁজ নেন এটা কিসের আওয়াজ? পরে জানলেন মুসলমানদের আজানের আওয়াজ। তখন তিনি মুসলমান হয়ে যান।

প্রশ্ন: কি কারণে মহানবী (স.) মক্কা হতে মদীনায় হিজরত করলেন? হিজরতের দরজা কখন পর্যন্ত খোলা থাকবে?

উত্তর: মক্কার অবিশ্বাসীদের ষড়যন্ত্রের মুখে আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (স.) হিজরত করেন। পূর্ববর্তী অনেক নবী রসূল ও হিজরত করেছেন। হিজরতের দরজা কেয়ামতের পূর্বে সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদয় হওয়া পর্যন্ত খোলা থাকবে।

প্রশ্ন: রসূল (সা:)-এর মদীনার সনদকে কি Constitution বা সংবিধান বলা যাবে? বিশ্লেষণ করবেন।

উত্তর: প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. হামীদুল্লাহ একটি বই লিখেছেন, যার শিরোনাম হচ্ছে The first written constitution of the world মওলানা আকরাম খাঁ তাঁর মোস্তফা চরিতে এটাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবিধান বলে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং মদীনার সনদকে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান বলা যায়।

প্রশ্ন: মহানবী (স.) ২৭টি যুদ্ধে সেনাপতি হিসেবে এবং ৫৬/৫৭টি যুদ্ধে প্রতিনিধি পাঠিয়ে করেছেন। এগুলো সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি?

উত্তর: ইসলাম আগে আক্রমণ করার ঘোষণা দেয় না। কেউ যদি অন্যায়ভাবে ইসলামের ওপর আক্রমণ করে তাহলে তা মোকাবেলা বা আত্মরক্ষা বা নিজকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা দেখবো যে, সব যুদ্ধই অন্যদের চাপিয়ে দেয়া। এমতাবস্থায় ইসলাম ও মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মুহাম্মদ (স.) মোকাবেলা করেছেন মাত্র।

প্রশ্ন: সিরাতুন্নবী (স.) ও মিলাদুন্নবী (স.) এর মধ্যে পার্থক্য কি? মিলাদুন্নবী (স.) -এর সাথে ঈদ শব্দ যোগ করে ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) বলা যাবে কি-না?

উত্তর: শাব্দিক দিক থেকে সিরাত অর্থ জীবন চরিত। আর সিরাতুন্নবী (স.) অর্থ নবী (স.) এর জীবন চরিত। আর মিলাদ অর্থ জন্মোত্সব বা জন্ম বৃত্তান্ত। মিলাদুন্নবী (স.) অর্থ নবী (স.) এর জন্মোত্সব বা জন্ম বৃত্তান্ত। নিশ্চয় পার্থক্যটা নিরূপিত হলো। সিরাতুন্নবী (স.) বললে তাঁর সমগ্র জীবন চরিতই এর মধ্যে থেকে যায় এমন কি মিলাদুন্নবী (স.) ও এর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু কেবলমাত্র মিলাদুন্নবী (স.) রসূল (স.)-এর সমগ্র জীবনের একটি পার্ট বা অধ্যায়। আর ঈদ অর্থ হলো আনন্দ। যেহেতু তিনি আমাদের আদর্শ। আমাদের শাফায়াতের কান্ডারী। তাঁর আগমন নিশ্চয় আমাদের কাছে আনন্দের বিধায় ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) বলা হয়। তবে রসূল (স.)-এর অন্য হাদীসে যে বলা হয়েছে, 'তোমাদের জন্য আল্লাহ দু'টি ঈদ দিয়েছেন একটি ঈদুল ফিতর অন্যটি ঈদুল আজহা। এটা ঐ ঈদের মত নয়।