Rangpur
September 20th, 2018
Tourism / ভ্রমণ
রেলের আয় বাড়ছে, সেবা কমছে
January 27th, 20114,268 views

স্বল্প খরচের বাহন রেলকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হবে, রেলের আধুনিকায়ন ও সেবা বাড়ানো হবে। এটি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের কথা। 
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সরকারের দুই বছরে রেলপথ এক কিলোমিটারও বাড়েনি। নতুন ইঞ্জিন ও কোচ আসেনি। রেলওয়ে আধুনিকায়নের ছোঁয়া পায়নি। উল্টো জনবলের অভাবে একের পর এক স্টেশন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কোনো ট্রেনই সময় মেনে চলতে পারছে না। রেলের আয় বাড়লেও যাত্রীসেবা কমছে।
২৬ জানুয়ারির চিত্র বলে দেয় কষ্টটা কত ভয়াবহ। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা থেকে ছাড়ার কথা রাত ১০টায়। সে অনুযায়ী টিকিটও বিক্রি হয়। যাত্রীরা স্টেশনে এসে প্রস্তুত। এমন সময় ঘোষণা আসে, ‘ট্রেনটির যাত্রা বাতিল করা হয়েছে। রাত ১১টার মধ্যে কাউন্টারে টিকিট জমা দিয়ে টাকা ফেরত নিয়ে যাবেন।’ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ট্রেন রাত ১০টায় ঢাকা ছাড়ার কথা থাকলেও তখনো লালমনিরহাটেই পৌঁছায়নি। সেখানে পৌঁছে ঢাকায় ফিরে আসতে ২২ ঘণ্টা দেরি হবে। তাই যাত্রা বাতিল করা হয়।
শুধু লালমনিরহাট এক্সপ্রেস নয়, ওই দিন দিনাজপুর থেকে ঢাকাগামী ‘একতা এক্সপ্রেস’ এক ঘণ্টা ৩২ মিনিট দেরিতে ছাড়ে। এই ট্রেন ঢাকায় পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা ৪০ মিনিট দেরিতে। খুলনা থেকে ঢাকায় আসতে ‘চিত্রা এক্সপ্রেস’ সময় নেয় নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা ৪৫ মিনিট বেশি। মহানগর প্রভাতী ৪৫ মিনিট দেরিতে ঢাকা ছাড়ে আর চট্টগ্রামে পৌঁছায় নির্ধারিত সময়ের চার ঘণ্টা ১০ মিনিট দেরিতে। চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি সিলেট আসা-যাওয়ার ট্রেন পাহাড়িকা এক্সপ্রেস চট্টগ্রামের বটতলী রেলস্টেশন থেকে যাত্রা করে নির্ধারিত সময়ের চার ঘণ্টা দেরিতে। সিলেটে পৌঁছাতে এই ট্রেনের সোয়া ছয় ঘণ্টা সময় বেশি লাগে।
সময় ধরে আন্তনগর ট্রেন চালানোর জন্য রয়েছে রেলের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কিন্তু ওপরের চিত্র বলে দিচ্ছে আন্তনগর ট্রেনের বেহাল দশার কথা। একই চিত্র প্রতিদিনই। আন্তনগর ট্রেনেরই যখন এ অবস্থা, তখন পণ্যবাহী ও কনটেইনার ট্রেন এবং লোকাল ও মেইল এক্সপ্রেস ট্রেনের পরিস্থিতি আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ২৮টি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। কিন্তু উত্তরবঙ্গের কয়েকটি শাখা লাইনের সংস্কার, যমুনা সেতুতে ওজন পরিমাপক যন্ত্র স্থাপনসহ ছোটখাটো প্রকল্প ছাড়া আর কোনোটার বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। গাজীপুরের ধীরাশ্রমে নতুন একটি অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও দোহাজারী-গুনদুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার দুটি প্রকল্প অনুমোদন করা হলেও অর্থের সংস্থান হয়নি। অনেক প্রকল্পের দরপত্রই চূড়ান্ত হয়নি। 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিবেশদূষণ, সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি এবং জ্বালানিস্বল্পতার কারণে সারা বিশ্বেই রেলের যাত্রী বাড়ছে। সে অনুযায়ী ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রেলওয়ের আধুনিকায়নে নতুন নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে রেলওয়ে উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে। 
বুয়েটের সাবেক উপাচার্য এ এম এম সফিউল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, উড়ালসড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন, পদ্মা সেতুসহ অসংখ্য প্রকল্পের ভারে রেল হারিয়ে যাচ্ছে। রেলকে আধুনিক ও এর প্রকল্প বাস্তবায়ন দ্রুত করার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় করতে হবে। সরকার ক্ষমতা নেওয়ার পরই ইঞ্জিন-কোচ ও লোকবলের সংকট দূর করার উদ্যোগ নিলে এত দিনে কিছুটা ফল পাওয়া যেত।
তবু যাত্রী ও আয় বাড়ছে: রেলওয়ের হিসাবে বাংলাদেশ রেলের যাত্রী ও আয় দুটোই বাড়ছে। ২০০৮ সালে রেল যাত্রী পরিবহন করে পাঁচ কোটি ৩০ লাখ ৮০ হাজার জন। ২০১০ সালে এই সংখ্যা বেড়ে হয় প্রায় আট কোটি। ২০০৭-০৮ অর্থবছরে রেলের আয় ছিল ৫৬১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৬২০ কোটি টাকা। যাত্রী-আয় বাড়লেও সেবা বাড়েনি।
মন্ত্রীর বক্তব্য: যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন গতকাল প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেন, ইঞ্জিন-কোচের সংকটে ট্রেন সময়মতো চলছে না। তিনি জানান, এ বছরের শেষ নাগাদ কিছু ইঞ্জিন আসবে। ভারতীয় ঋণে কোচ কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সেটাও আগামী বছর পাওয়া যাবে। সাড়ে সাত হাজার লোক নিয়োগও এ বছরের মধ্যে হবে। মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আগের সাত বছর রেলের উন্নয়নে কাজ হয়নি। আমি শূন্য থেকে শুরু করেছি। ফল পেতে এ বছরটা অপেক্ষা করতে হবে।’
মন্ত্রী আশার কথা বললেও রেলওয়ের পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই বছরের ব্যবধানে রেলের সেবার মান নিম্নমুখী হয়েছে। এই সময়ে সব ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা হ্রাস পায়। এমনকি কোনো কোনো আন্তনগর ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা শূন্যতে নেমে আসে, যা রেলের ১৫০ বছরের ইতিহাসে হয়নি।
সূত্র জানায়, এ মাসের ২৭ দিনে ৫২টি আন্তনগর ট্রেনের সময়মতো চলাচলের (সময়ানুবর্তিতা) হার ছিল ৫০ শতাংশের নিচে। ২৬ জানুয়ারি ৫২টি ট্রেনের মধ্যে মাত্র ১৮টি সময় ধরে চলাচল করে। বাকিগুলো ছেড়ে যায় বিলম্বে, গন্তব্যে পৌঁছাতেও দেরি করে। আন্তনগর ট্রেনের সময়ানুবর্তিতার হার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে এলেই সেবার মান কমেছে বলে ধরা হয়।
রেলের পূর্বাঞ্চলের উপপ্রধান অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট মো. ফিরোজ ইফতেখার প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০০৭ সালে একবার ট্রেনের গড় নিয়মানুবর্তিতা শতভাগ অর্জিত হওয়ায় আমরা সবাই মিলেমিশে মিষ্টি খেয়েছিলাম। এরপর ২০০৮ সাল পর্যন্ত ট্রেনের গড় সময়ানুবর্তিতা ৯০-৯৫ শতাংশ ছিল। এরপর পরিস্থিতির অবনতি শুরু হয়।’ 
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. তহিদুল আনোয়ার চৌধুরী রেলের সময়ানুবর্তিতা হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ইঞ্জিন-কোচসহ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা সময়মতো ট্রেন চালাতে পারছি না, এটা ঠিক। তবে আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা সবকিছু ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছি।’
রেললাইন বাড়েনি, স্টেশন বন্ধ: লোকবলস্বল্পতার কারণে কয়েক বছরে রেলের মোট ১১৭টি স্টেশন বন্ধ করে দিতে হয়েছে। বন্ধের এই তালিকায় রয়েছে পূর্বাঞ্চলে ৪৫টি ও পশ্চিমাঞ্চলে ৭২টি স্টেশন। গত বৃহস্পতিবারও যশোর এলাকার সফদরপুর স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়। এই সময়ে রেলের দুই অঞ্চলে বেশ কিছু শাখা লাইন বন্ধ কিংবা লাইনে ট্রেন চলাচল কমানো হয়েছে। রেলের যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, বন্ধ স্টেশনের কারণে ট্রেনের গতি সীমিত রাখতে হচ্ছে।